মনসামঙ্গল কাব্যের কাহিনী | Story of Mansamangal Kavya
■ ভূমিকা:- মঙ্গলকাব্যগুলির মধ্যে মনসামঙ্গল সবচেয়ে প্রাচীন। সম্ভবত পনেরো শতকে প্রথম পূর্ণাঙ্গ মনসামঙ্গল কাব্য রচিত হয়েছিল। সারা ভারতে সাপের খুব উপদ্রব ছিল। সাপ থেকে রক্ষা পাবার জন্য সর্পদেবী মনসার উদ্ভব হয়েছে। উভয় বাংলায় বিভিন্ন অঞ্চলে মনসামঙ্গলের যেসব পুঁথি পাওয়া গেছে তার মূল আখ্যান একই রকম হলেও অঞ্চলভেদে কমবেশি পার্থক্য আছে। কাব্যের প্রধান উদ্দেশ্য মনসার পূজা ও মহিমা প্রচার।
■ কাহিনী:- মনসামঙ্গলের কাহিনীর দুটি অংশ, দেবখণ্ড ও নরখণ্ড। দেবখণ্ডে মনসার জন্মকাহিনী ও স্বর্গের দেবদেবীর প্রশস্তি আছে। শিবের মন থেকে জন্ম বলে সর্পদেবীর নাম হল মনসা। কেয়াপাতার জন্ম নিয়েছিলেন বলে ‘কেতকা’ নামেও তিনি পরিচিত। কোনো কোনো পুথিতে তাঁর জন্ম পদ্মপাতায়। তাই তিনি পদ্মা বা পদ্মাবতী। এই কারণে মনসামঙ্গলকে পদ্মাপুরাণও বলা হয়। মেয়েকে নিয়ে মহাদেব কৈলাসপুরীতে এলেন। কিন্তু বিমাতা চণ্ডীর সঙ্গে কার বনিবনা হল না। চণ্ডীর সঙ্গে ঝগড়া করে তাঁর এক চোখ কানা হয়ে গেল। এইজন্য চাঁদ সদাগর মনসাকে ‘চ্যাংমুড়ী কানি’ বলে গালি দিতেন। জরৎকারু মুনির সঙ্গে মনসার বিয়ে হয়, কিন্তু স্বামীর সঙ্গেও তিনি ঘর করতে পারলেন না। জয়ন্তীগরের নির্মাণ করে তিনি স্বাধীনভাবে বাস করতে লাগলেন। সঙ্গে রইলেন সহচারী নেতা ধোপানী। এখানে দেবখণ্ডের সমাপ্তি।
এরপর নরখণ্ড মর্তে চণ্ডী ও শিবের পূজো দেখে মনসা নিজের পুজো প্রচারে উদ্যোগী হলেন। প্রথমে নিচুতলার মানুষের মধ্যে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করলেন। কিন্তু উঁচু সমাজে পুজোর প্রচান না হলে তাঁর প্রতিষ্ঠা সম্পূর্ণ হবে না। তাই তিনি ধরলেন বণিকসমাজের প্রধান চাঁদ সদাগরকে। চাঁদ শিবের পুজো করেন, তিনি স্ত্রী-দেবতাদের পুজো করতে রাজি হলেন না। মনসা তাঁকে জয় করতে না পেরে ভয় দেখানোর পথ ধরলেন। প্রথমে চাঁদের সাধের বাগান বাড়িটি তিনি ধ্বংস করলেন, তারপর চাঁদের বন্ধু ধন্বন্তরীকে হত্যা করে মহাজ্ঞান মন্ত্র হরণ করে নিলেন। মনসার কোপে একে একে চাঁদের ছয় ছেলের প্রাণ গেল। তাঁর চোদ্দটি বাণিজ্যতরী ডুবে গেল, সর্বনাশের শেষ সীমায় দাঁড়িয়ে চাঁদ অবিচল, কোনো অবস্থাতেই তিনি মনসার পূজো করবেন না।
কিন্তু চাঁদের পুজো ছাড়া মনসার চলবে না। তাই মসনা চাঁদের স্ত্রী সনকাকে গোপনে পুত্রবর দিলেন। বৃদ্ধ বয়সে চাঁদের এই পুত্রের নাম হল লখিন্দর। মনসার শর্ত ছিল চাঁদ মনসার পুজো না করলে বিয়ের রাত্রে লখিন্দরের মৃত্যু ঘটবে। চাঁদ লোহার বাসর তৈরি করে পুত্রের বিয়ে দিলেন। মনসার ষড়যন্ত্রে সেখানে একটি সূক্ষ্ম ছিদ্র ছিল। কালনাগিনী সেই পথে প্রবেশ করে লখিন্দরকে দংশন করল। বাসরঘরে লখিন্দর মারা গেল। গভীর শোকে চাঁদ সদাগর কলার ভেলায় ছেলের মৃতদহে ভাসিয়ে দিলেন। সদ্য বিধবা বেহুলা জেদ করে স্বামীর ভেলায় ভেসে চললেন। স্বামীর জীবন তিনি ফিরিয়ে আনবেন। পথে অনেক প্রলোভন ও কষ্ট সহ্য করে লখিন্দরের দেহাবশেষ নিয়ে বেহুলা নেতা ধোপানীর সাহায্যে স্বর্গে এসে পৌঁছুলেন। বেহুলার নাচগানে খুশি হয়ে মহাদেব মনসাকে নির্দেশ দিলেন লখিন্দরের প্রাণ ফিরিয়ে দিতে।
কিন্তু বেহুলাকে প্রতিজ্ঞা করতে হল চাঁদ সদাগরকে দিয়ে তিনি মনসার পুজো করাবেন। ছয় ভাসুর, চোদ্দডিঙা ও লখিন্দরকে সঙ্গে করে বেহুলা মর্তের ঘাটে ফিরে এলেন। বৃদ্ধ শ্বশুর পুত্রবধূর কথা ফেলতে পারলেন না, স্নেহের কাছে বশ মানলেন। ডান হাতে তিনি শিবপুজো করেন, তাই বাঁ হাতে মনসার উদ্দেশে তিনি ফুল ছুড়ে দিলেন, এতেই মনসা সন্তুষ্ট। মর্তে মনসার পুজো প্রচলিত হল।